উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পাড়া: রানওয়ে সম্প্রসারণে উচ্ছেদের মুখে ২২ হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তু

কক্সবাজার

 

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কক্সবাজার, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র আঘাত এবং রাষ্ট্রীয় মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের টানাপোড়েনে এক চরম মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘কুতুবদিয়া পাড়া’ ও ‘সমিতি পাড়া’র বাসিন্দারা। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে নিজেদের আদি ভিটেমাটি বঙ্গোপসাগরে হারিয়ে মূল ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া এই মানুষগুলো তিন দশক পর আজ আবারও এক নতুন বাস্তুচ্যুতির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।

১. কুতুবদিয়ার ভূ-প্রকৃতি এবং জলবায়ু ট্র্যাজেডি

কুতুবদিয়া চ্যানেল দ্বারা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শুরু থেকেই এই দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের তীব্র ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস এবং ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি। গত দুই দশকে অব্যাহত উপকূলীয় ভাঙনের ফলে দ্বীপটির মূল ভূখণ্ড প্রায় অর্ধেক সংকুচিত হয়ে ১০০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে।

এই ভৌগোলিক ক্ষয়ের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক স্মারক হয়ে আছে ১৮৪৬ সালে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত কুতুবদিয়ার ঐতিহাসিক বাতিঘরটি। একসময় যা বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজকে পথ দেখাত, সাগরের অব্যাহত গ্রাসে আজ তার পাথুরে ও ইটের কঙ্কাল জোয়ারের পানির নিচে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত থাকে; কেবল চরম ভাঁটার সময় তা দৃশ্যমান হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ধুরুং আলী ফকিরের ডৈইলে একটি আধুনিক (Skeletal) বাতিঘর নির্মাণ করা হলেও, চলমান উপকূলীয় ভাঙনে সেটিও এখন চরম ঝুঁকিতে।

২. অবকাঠামোগত ব্যর্থতা ও মরিচা ধরা স্বপ্ন

দ্বীপের এই তীব্র জলবায়ু ঝুঁকিকে উপেক্ষা করে অতীতে নেওয়া টেকসইহীন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের তাবলরচর উপকূলে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি অগ্রগামী উইন্ড-ব্যাটারি হাইব্রিড বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে। কিন্তু চালু হওয়ার মাত্র এক বছর পর, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার জলোচ্ছ্বাসে এর অফ-গ্রিড ব্যাটারি ব্যাংক এবং নিয়ন্ত্রণ কক্ষ নোনা পানিতে তলিয়ে যায়।

পরবর্তীতে পূর্বের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০১৭ সালে সেখানে আরও ২০টি বড় টারবাইন যুক্ত করে ২ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয় এবং ব্যাটারির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এটিকে একটি ‘গ্রিড-টাইড মিনি-গ্রিড’ হিসেবে নকশা করা হয়। তবে স্থায়ী ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ না থাকায় এবং বারবার ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ত বাতাসের প্রভাবে পুরো প্রকল্পটিই আজ সম্পূর্ণ অচল ও পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, যা পরিবর্তনশীল উপকূলে অপরিকল্পিত অবকাঠামোর এক নীরব স্মারক।

৩. ডাবল ডিসপ্লেসমেন্ট: উদ্বাস্তু জীবনের নির্মম চক্র

কুতুবদিয়ার এই ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত সংকটের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এর মানবিক সংকট। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে সবকিছু হারিয়ে প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ পরিবার (অনূর্ধ্ব ৪০,০০০ মানুষ) কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে বিমানবন্দরের পাশে সরকারি খাস জমিতে আশ্রয় নেয়। বিগত ৩৫ বছরে কুতুবদিয়ার পাশাপাশি মহেশখালী ও বাঁশখালীর অন্যান্য জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও এই অববাহিকায় যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে কুতুবদিয়া পাড়া ও সমিতি পাড়ার জনসংখ্যা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজারে পৌঁছেছে।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিলে এই বিশাল জনবসতি উচ্ছেদের মুখে পড়ে। সরকার জলবায়ু শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প” চালু করে ৪,৪০৯টি জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আধুনিক ফ্ল্যাট দেওয়ার উদ্যোগ নেয়।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকার কারণে কুতুবদিয়া পাড়ার প্রায় ৪,৫০০টি পরিবার (২২,০০০-এর বেশি মানুষ) এই পুনর্বাসন তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বর্জনের শিকার হয়েছে। মাথার গোঁজার ঠাঁই হারানোর আশঙ্কায় গত ৭ জানুয়ারি ২০২৫-এ হাজার হাজার শরণার্থী কক্সবাজারের প্রধান মহাসড়ক অবরোধ করে গণবিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিক্ষোভকারীদের স্পষ্ট দাবি—সর্বজনীন পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে তাদের উচ্ছেদ করা হলে তারা পর্যটন শহরকে স্তব্ধ করে দেবে।

৪. জীবিকার রূপান্তর ও নতুন পরিবেশগত সংকট

এদিকে পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর জীবনেও নেমে এসেছে নতুন অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। খুরুশকুলের বহুতল ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ ও পানির সুবিধা থাকলেও তা সমুদ্রের মৎস্য জেটি থেকে অনেক দূরে। ফলে জেলেদের যাতায়াত খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং সাগরে মাছ ধরার উৎপাদনশীলতা কমে গেছে।

অন্যদিকে, কুতুবদিয়া দ্বীপে নোনা পানি প্রবেশের ফলে সনাতন কৃষি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পুরো দ্বীপটি এখন লবণ চাষের ওপর নির্ভরশীল। এই লবণ শিল্প বৃহত্তর কক্সবাজারে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান নিয়ন্ত্রণ করলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসময়ের বৃষ্টিপাতে চাষিরা প্রায়ই লোকসানের মুখে পড়ছেন। তাছাড়া, লবণ প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি উত্তোলনের ফলে কুতুবদিয়া দ্বীপের অগভীর অ্যাকুইফারগুলো শূন্য হয়ে পড়ছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য জরুরি সুপারিশমালা

  • তালিকা পুনর্নিরীক্ষণ: ভূমি মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত খুরুশকুল প্রকল্পের তালিকা পুনর্নিরীক্ষণ করে বাদ পড়া ৪,৫০০টি পরিবারের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

  • জীবিকা সচল রাখা: খুরুশকুল প্রকল্পে দ্রুত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শুঁটকি মহাল চালু করা এবং জেলেদের জন্য জেটি পর্যন্ত বিশেষ যাতায়াত সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।

  • প্রকৃতি-ভিত্তিক বেড়িবাঁধ: কুতুবদিয়াকে রক্ষায় কেবল কংক্রিটের ব্লকের পরিবর্তে গতিশীল ম্যানগ্রোভ বনায়ন (Nature-based solutions) গড়ে তুলতে হবে।

  • বিকেন্দ্রীকৃত সৌর শক্তি: ব্যর্থ উইন্ডমিল প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্বীপে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় সোলার মিনি-গ্রিড এবং সৌরচালিত পানি শোধন প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *