উপকূলের কণ্ঠস্বর ও আগামীর ব্লু ইকোনমির স্বপ্নদ্রষ্টা ড. হামিদুর রহমান আযাদ
আলি ওসমান শেফায়ত
বাংলাদেশের মানচিত্রে একেবারে দক্ষিণে জেলা কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়া কেবল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্ন দুটি দ্বীপ নয়; বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির এক বিশাল প্রবেশদ্বার এবং অমিত সম্ভাবনার উৎস। তবে এই লোনাজল অঞ্চলের ইতিহাস যেমন বীরত্বগাথার, তেমনি বঞ্চনারও। দীর্ঘকাল ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ—ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা আর অবকাঠামোগত অবহেলার শিকার এই জনপদ যখনই একজন প্রাজ্ঞ ও দরদী অভিভাবক পেয়েছে, তখনই সেখানে উন্নয়নের নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার সেই কাঙ্ক্ষিত অভিভাবক ও উন্নয়নকামী জনতার কণ্ঠস্বরের নাম ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-০২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে তাঁর প্রার্থিতা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং উপকূলীয় অঞ্চলের অস্তিত্ব রক্ষা ও সমৃদ্ধ আগামীর এক মহাপরিকল্পনা।
প্রারম্ভিক ও বর্ণাঢ্য শিক্ষাজীবন:
জাতির এই সাহসী সন্তান ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি একাধারে একজন লেখক, গবেষক, প্রাজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান এবং সমাজ সংস্কারক। ১৯৬৫ সালের ১ ডিসেম্বর কুতুবদিয়ার এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা প্রখ্যাত আলেম মৃত মাওলানা ক্বারী আবদুস সালাম এবং মাতা আদিমুন্নিছা। তাঁর শিক্ষাজীবন ঈর্ষণীয় সাফল্যের স্বাক্ষর বহন করে। বিএ (অনার্স), এমএ, এলএলবি এবং এমএম ডিগ্রি অর্জনের পরেও জ্ঞান অন্বেষণের তৃষ্ণা তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেননি; সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘বাংলায় ইসলামী রাজনীতির উৎপত্তি ও বিকাশ (১৯০৫-১৯৭০)’, যা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও তাত্ত্বিক গভীরতারই বহিঃপ্রকাশ। ১৯৯৬ সালে কুতুবদিয়ার ঐতিহ্যবাহী মাতবর বাড়ির কন্যা জেবুন্নেচ্ছের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং বর্তমানে তিনি চার কন্যাসন্তানের জনক।
রাজনৈতিক সংগ্রাম ও জুলুমের ইতিহাস:
ড. হামিদুর রহমান আযাদের রাজনৈতিক জীবন ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অনন্য উপাখ্যান। ১৯৭৭ সালে ছাত্রশিবিরে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু, যেখানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালনসহ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৫ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানের পর তিনি সংগঠনের রুকন, থানা সভাপতি থেকে শুরু করে বর্তমানে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেতা ও ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক কনফেডারেশন অব লেবার (IICL)-এর সাথে যুক্ত।
তবে এই দীর্ঘ পথে তাঁকে চরম জুলুম সহ্য করতে হয়েছে। ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় গিয়ে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার ও গ্রেপ্তার হন। ২০০০ সালে আওয়ামী দুঃশাসন বিরোধী আন্দোলনে তিনি দুইবার গুলিবিদ্ধ ও মারাত্মক আহত হন। ২০১৮ সালসহ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অসংখ্য মিথ্যা মামলা, রিমান্ড ও দীর্ঘ কারাবরণ করলেও তিনি তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর সততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা এমন ছিল যে, তৎকালীন প্রশাসন শত চেষ্টা করেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ খুঁজে পায়নি। সকল বাধা মাড়িয়ে তিনি আজ জাতীয় রাজনীতির এক প্রভাবশালী ও গ্রহণযোগ্য মজলুম জননেতা।
নবম সংসদ: উন্নয়নের এক স্বর্ণালী অধ্যায় (২০০৮-২০১৩)
২০০৮ সালে যখন তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তখন দেশ এক প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বিরোধী দলের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও কৌশলী তৎপরতার মাধ্যমে মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় উন্নয়নের যে মহোৎসব শুরু করেছিলেন, তা এই অঞ্চলের ইতিহাসে গত কয়েক দশকেও দেখা যায়নি।
১. টেকসই বেড়িবাঁধ ও উপকূল রক্ষা:
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে ড. হামিদুর রহমান আযাদ উপকূলীয় মানুষের প্রধান শত্রু ‘সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস’ মোকাবিলায় আমূল পরিবর্তন আনেন। তাঁর সক্রিয় তৎপরতায় মহেশখালীর ধলঘাট ও মাতারবাড়ীতে প্রায় ২৫ কোটি টাকার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়। কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল ও উত্তর ধুরুং এলাকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৫৯ কোটি টাকার স্থায়ী রক্ষাবাঁধের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়। যা আজও কয়েক লক্ষ মানুষের জানমাল রক্ষা করে চলেছে।
২. যোগাযোগ ও অবকাঠামোর বৈপ্লবিক রূপান্তর:
বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপগুলোকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতে তিনি গোরকঘাটা-জনতাবাজার সড়ক সংস্কারসহ মহেশখালীতে ২৯টি বড় প্রকল্পে প্রায় ৬০ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করেন। কুতুবদিয়ায় আজম রোডসহ ৩৪টি প্রকল্পে ১২.৫ কোটি টাকার সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। দরবারঘাটে আধুনিক জেটি নির্মাণ এবং ফেরিঘাটের যাত্রীসেবা মানোন্নয়ন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন।
৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নবদিগন্ত:
তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই মুক্তির পথ। তাঁর হাত ধরেই কুতুবদিয়া টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মহেশখালী কলেজে অনার্স কোর্স চালু হয়। অসংখ্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আধুনিক ভবন নির্মাণ এবং স্থানীয় ৩টি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ তাঁর শিক্ষার প্রতি অনুরাগেরই ফল। স্বাস্থ্যসেবায় দুই উপজেলার হাসপাতালেই ৫০ শয্যার ভবন নির্মাণ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক চালুকরণ ছিল তাঁর অন্যতম অগ্রাধিকার।
জুলাই বিপ্লব উত্তর নতুন বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা:
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. হামিদুর রহমান আযাদ জাতীয় রাজনীতির এক অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
১. জাতীয় ঐক্যের প্রতীক: ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মুখ্য সমন্বয়ক এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
২. তাৎক্ষণিক উন্নয়ন: বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ড. হামিদুর রহমান আযাদ মহেশখালী-কক্সবাজার নৌ-রুটে সি-ট্রাক চালু এবং কুতুবদিয়ায় সি-ট্রাক চালুর পরিকল্পনাসহ ৩ হাজার কোটি টাকার স্থায়ী বেড়িবাঁধ প্রকল্পের প্রাথমিক ডিপিপি অনুমোদনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন।
কেন ড. হামিদুর রহমান আযাদ?
আসন্ন নির্বাচনে কেন ভোটাররা তাঁকে বেছে নেবেন—এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা, অভিজ্ঞতা এবং নিঃস্বার্থ সেবার মাঝে:
১. পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত নেতৃত্ব: তিনি কেবল বসন্তের কোকিল নন; বরং ২০০৮ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তাঁর কাজের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সম্পদ ও বরাদ্দের সুষম বণ্টন এবং সততার মাধ্যমে কীভাবে এলাকার চেহারা বদলে দেওয়া যায়। তাঁর মেয়াদে শত-শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ সরকার শত চেষ্টা করেও খুঁজে পায়নি।
২. নির্যাতিত ও মজলুম জননেতা: বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তিনি ভয়াবহ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। ৭২টির মতো মিথ্যা মামলা, দফায় দফায় রিমান্ড এবং বছরের পর বছর কারান্তরালে থেকেও তিনি জনপথের দাবি থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর এই ত্যাগই তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান দিয়েছে।
৩. উন্নয়ন ও সুশাসনের কারিগর: তিনি সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে পছন্দ করেন। প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি এক বিরল উদাহরণ। বিশেষ করে রামুর ঘটনার সময় তাঁর এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ছিল তাঁর নেতৃত্বের এক বড় পরীক্ষা ও সাফল্য।
৪. জাতীয় পর্যায়ে উপকূলের কণ্ঠস্বর: তিনি কেবল মহেশখালী-কুতুবদিয়ার নেতা নন, বরং তিনি পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকার আদায়ের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। সংসদে লবণ চাষীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তায় তাঁর সাহসী বক্তব্য আজও নথিবদ্ধ।
৫. প্রাজ্ঞ লেখক ও বক্তা: ‘উপকূল ও আমার জীবন’, ‘দুঃশাসনের ২৫ বছর’ এবং ‘বাংলাদেশের উপকূলবাসীর বাঁচার অধিকার’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি উপকূলের সমস্যাগুলো জাতীয়ভাবে তুলে ধরেছেন। যা এ অঞ্চলে এযাবৎকালে আর কেউ করতে পারেননি।
আগামীর স্বপ্ন
ড. হামিদুর রহমান আযাদ কেবল অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চান না; তাঁর আগামীর ভিশন অত্যন্ত আধুনিক ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন। তিনি এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত ‘মাস্টারপ্ল্যান’ তৈরি করেছেন:
১. সিঙ্গাপুর মডেলের আধুনিক শহর: মহেশখালী ও কুতুবদিয়াকে কেন্দ্র করে এশিয়ার অন্যতম আধুনিক বাণিজ্যিক হাব ও পরিকল্পিত স্মার্ট সিটি গড়ে তোলা। যেখানে গভীর সমুদ্রবন্দরের সুফল প্রতিটি ঘরে পৌঁছাবে।
২. স্থানীয়দের শতভাগ কর্মসংস্থান: মাতারবাড়ী ও সোনাদিয়ার মেগা প্রকল্পগুলোতে বহিরাগতদের বদলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের চাকরির ব্যবস্থা করা এবং মেগা প্রকল্পের জন্য ভূমি হারানোদের উপযুক্ত পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
৩. ব্লু-ইকোনমি ও পর্যটন বিপ্লব: সাগরের বিশাল মৎস্য ও খনিজ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নীল অর্থনীতি সচল করা। সোনাদিয়া ও কুতুবদিয়াকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করা।
৪. সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি: প্রতিটি ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং সাশ্রয়ী গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।
৫. আইন-শৃঙ্খলা ও মানবিক সমাজ: দখলদারিত্ব, মিথ্যা মামলা এবং মাদকের ছোবল থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে নৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং পৃথক আধুনিক স্টেডিয়াম ও যুব উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা।
উপসংহার:
ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ কেবল একজন জনপ্রতিনিধি নন, তিনি একটি আদর্শের নাম। তাঁর সততা, মেধা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাই পারে মহেশখালী ও কুতুবদিয়াকে একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ জনপদে রূপান্তর করতে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যখন ন্যায়বিচার ও সুশাসনের জোয়ার বইছে, তখন মহেশখালী-কুতুবদিয়ার উন্নয়নের চাবিকাঠি তাঁর মতো একজন প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের হাতে তুলে দেওয়া আজ সময়ের দাবি। আগামীর সমৃদ্ধ ও আধুনিক জনপদ গড়তে তাঁর প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ মার্কাই হোক আপামর জনগণের আস্থার ঠিকানা।

