১৯৯১ সালের ২৯ শে এপ্রিল প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘ম্যারি এন’ এর স্মরণে
স্মরণাতীত কাল হতে অসংখ্য ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনেছে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠা কুতুবদিয়া দ্বীপে। যতদূর জানা যায়, তাতে দেখা যায় উপকূলীয় জনপদ অসংখ্যবার প্রাকৃতিক ছোবলের শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সমগ্র উপকূল। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি কখনো আবার ভূমিকম্পের মতো মারাত্মক বিপর্যয়ও নেমে এসেছে উপকূলীয় অঞ্চলে।
তেমনি এক ঘটনা ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ‘ম্যারি এন’ নামে ১৯৯১ সালের এই দিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চল। ভয়াবহ সে দিনের ৩৪ বছর অতিবাহিত হলেও আজও সে দুর্বিষহ স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় উপকূলের বাসিন্দাদের। আজ থেকে ৩৪ বছর আগে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছিল স্মরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। রাতের অন্ধকারে মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল উপকূলীয় এলাকা।
২৩ এপ্রিল সকালের দিকে লঘুচাপ হিসেবে ধরা পড়ে এটি। যার অবস্থান ছিল ভারতের আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে। এরপর থেকে এটি ধীরে-ধীরে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। ২৫ এপ্রিল সকালের দিকে এটি নিম্নচাপে পরিণত হয়। ২৭ এপ্রিল সকালে এটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। সে দিন মধ্যরাতেই এটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। ২৮ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে এটি হারিকেন শক্তি সম্পন্ন প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় বলে জানা যায় সেই সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায়।
এ দিন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া। এই বিচ্ছিন্ন উপজেলার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিল। পুরো দ্বীপাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের ছোবলে বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছিল। এতে বিধ্বস্ত হয় পুরো উপকূলীয় অঞ্চল। যেখানে সেখানে পড়েছিল লাশ, রাস্তা জুড়ে ছিল উপড়ে পড়া গাছ, ঘর-বাড়িগুলো দুমড়ানো-মোচড়ানো, আর লাশের পচা গন্ধ বাতাসটাকে ভারী করে তুলছিল।
ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটার গতিবেগে বাতাস প্রায় ২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস নিয়ে রাত প্রায় ১২ টা নাগাদ উপকূলে আছড়ে পড়ে হারিকেনের শক্তিসম্পন্ন প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ম্যারি এন’। মূলত বিকাল থেকে বইতে থাকা দমকা বাতাস প্রবল এক ঝড়ের আভাস দিচ্ছিল।
জানা যায়, ভেলার মতো ভেসে গিয়েছিল অগণিত মানুষ। সেদিন প্রিয়জন হারিয়ে আজো কাঁদছেন অনেক স্বজন। কুতুবদিয়া উপকূলসহ দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা প্রায় ১২ ফুট পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। সরকারি হিসাবে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় প্রাণহানি হয়েছে প্রায় ১০ হাজার লোকের। তবে, বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা হবে দ্বিগুণ। সেদিন ঝড়ের প্রভাবে মারা যায় ২০ লাখ গবাদি পশু। গৃহহারা হয়েছিল হাজার হাজার পরিবার। বিনষ্ট হয়েছে শত কোটি টাকার সম্পদ। স্বজন হারানোর বেদনায় এখনও কাঁদে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার বাসিন্দারা।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আহবান জানাচ্ছি দেশের উপকূলবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য উপকূলীয় মন্ত্রণালয় নামে একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় চালু করে দেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার সংশ্লিষ্ট উপজেলাকে প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন উপহার দিবেন।
২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারানো সবাইকে স্মরণ করছি বিনম্র শ্রদ্ধায় আর নিহত মুসলমানের জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট মাগফেরাত কামনা করছি।
~ আলী ওসমান শেফায়েত

