কক্সবাজার ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অতিভারী বর্ষণে ভয়াবহ পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ ৯ জনের নির্মম মৃত্যু। প্রকৃতির এই তীব্র প্রতিশোধের পেছনে দায়ী মানুষেরই তৈরি পরিবেশগত বিপর্যয়। এখনই সচেতন না হলে অপেক্ষা করছে আরও বড় বিপদ।

কক্সবাজার

কক্সবাজার প্রতিনিধি | দৃষ্টি নিউজ নেটওয়ার্ক

প্রকাশিত: ০৬ জুলাই, ২০২৬

কক্সবাজার: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও অত্যন্ত সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে অবিরত অতিভারী বর্ষণ চলছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৫০ থেকে ২৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই চরম আবহাওয়ার মধ্যে সোমবার (৬ জুলাই) ভোররাতে উখিয়ার তিনটি পৃথক রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের একটি এলাকায় ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। মাটিচাপায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করায় কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

এক নজরে দুর্ঘটনা ও হতাহতের বিবরণ

ভোর ১:০০ টা থেকে ৪:৩০ টার মধ্যে সংঘটিত পাহাড়ধসের বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

দুর্ঘটনার স্থান ও সময় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা নিহতদের পরিচয় ঘটনা ও উদ্ধার তৎপরতা

ক্যাম্প-১৫ (জامتলী)


ব্লক ডি/৬, পালংখালী, উখিয়া


(ভোর ১:১০ – ১:৩০)

৩ জন মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাঁদের চার বছরের পুত্র মোহাম্মদ আনাস (৪)। পাহাড়ের বিশাল অংশ বসতঘরের ওপর ধসে পড়ে। ঘরটিতে মোট ১০ জন সদস্য ছিলেন। ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবকরা ৩টি মরদেহ এবং ২ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

ক্যাম্প-৭ (কুতুপালং)


ব্লক ডি/৭, রাজাপালং, উখিয়া


(ভোর ১:৪৫ – ২:০০)

১ জন একরাম (৭), পিতা: মোহাম্মদ রশিদ। পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা মাটির নিচে চাপা পড়ে ঘরের ভেতর থাকা এই শিশুর মৃত্যু হয়। স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক দল মাটি সরিয়ে তার লাশ উদ্ধার করে।

ক্যাম্প-১১ (বালুখালী)


ব্লক সি/১১, উখিয়া


(ভোর ৩:০০ – ৩:৩০)

৪ জন উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩), এবং দুই ভাই মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। আকস্মিক মাটিচাপায় একই পরিবারের চারজন ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ হারান এবং আরও একজন গুরুতর আহত হন।

ছাত্তার ঘোনা এলাকা


১২ নং ওয়ার্ড, কক্সবাজার পৌরসভা


(ভোর ৩:০০ – ৪:৩০)

১ জন স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর (৫০)। পাহাড়ের অংশ ভেঙে ঘরের ওপর পড়লে একই পরিবারের ৩ জন মাটিচাপা পড়েন। প্রতিবেশীরা তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন।

ব্যাহত উদ্ধার অভিযান ও বর্তমান পরিস্থিতি

দুর্যোগের খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন (APBn), ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে টানা অতিভারী বৃষ্টিপাত এবং পার্বত্য অঞ্চলের মাটির চরম অস্থিরতার কারণে উদ্ধার তৎপরতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত পরিবারগুলোকে অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্য নিয়মিত মাইকিং করে সতর্কবার্তা জারি করা হচ্ছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অন্তত ৮০ হাজার মানুষ বর্তমানে চরম ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। জানমালের ক্ষতি এড়াতে সবাইকে দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই নিয়মিত পাহাড়ধসের নেপথ্যে মানুষের তৈরি পরিবেশগত বিপর্যয় সরাসরি দায়ী। ২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফে প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়েছিল। বর্তমানে প্রায় সাড়ে চৌদ্দ লাখ রোহিঙ্গা এই ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে বসবাস করছে। আবাসন ও রান্নার জ্বালানির জন্য নির্বিচারে পাহাড়ের ঢাল ও মাটি কাটার ফলে মাটির ক্ষয়রোধকারী শিকড়যুক্ত বৃক্ষরাজি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। এর সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা যুক্ত হওয়ায় মাটির অভ্যন্তরীণ পানির চাপ বাড়ছে, যা পাহাড়ধসের ঘটনাকে ত্বরান্বিত করছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী আরও দুইদিন এই ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে, যা দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *