কুতুবদিয়া, ২৪ জুন ২০২৫:
—————————–
দীর্ঘদিনের অবহেলিত দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার জনগণের জীবনমান উন্নয়নে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কুতুবদিয়া চ্যানেল, মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম, সেখানে ফেরি সার্ভিস চালু এবং দ্বীপের প্রধান সড়ক আজম রোড (Z1076) উন্নতকরণের দাবিতে ‘দ্বীপশিখা’ (কুতুবদিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা)-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
গত ১ জুন ২০২৫ তারিখে দ্বীপশিখার সভাপতি ও বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান কুতুবদিয়ার পক্ষ থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টার কাছে একটি বিস্তারিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে কুতুবদিয়ার বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। উল্লেখ করা হয়, ১৯৬০ সালের ২৫০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কুতুবদিয়া বর্তমানে ১০০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে, যার অর্ধেকেরও বেশি অংশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন। প্রায় দুই লক্ষ মানুষের এই দ্বীপের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল, ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থায়ী। নারী, শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী এবং জরুরি রোগীদের ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও স্পিডবোটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সম্প্রতি চ্যানেলে সন্তান প্রসবের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনাও ঘটেছে, যা নিরাপদ যোগাযোগের অপরিহার্যতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
আবেদনে আরও জানানো হয় যে, সীতাকুন্ড-সন্দ্বীপ ও মহেশখালীতে ফেরি/সি-ট্রাক সার্ভিস চালুর ফলে সেখানকার অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে, ঠিক তেমনি কুতুবদিয়ায় ফেরি সার্ভিস চালু হলে দ্বীপবাসীর যোগাযোগ সহজ হবে, কৃষিজ পণ্য পরিবহন সহজতর হবে, অর্থনৈতিক গতি আসবে, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ সহজ হবে, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং পীর আব্দুল মালেক শাহ (রঃ) এর মাজারে আগত ভক্তদের যাতায়াতও সুগম হবে। একইসাথে, কুতুবদিয়ার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত মাত্র ৩.৫ মিটার প্রশস্ত আজম রোড (Z1076) এর বেহাল দশার কথাও তুলে ধরা হয়, যেখানে প্রায়শই মুখোমুখি সংঘর্ষে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। সড়কটিকে ৭.৩ মিটার প্রশস্ততায় উন্নীত করার জোর দাবিও জানানো হয়।
দ্বীপশিখার এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ২৩ জুন ২০২৫ তারিখে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটি স্মারক (স্মারক নং-৩৫.০০.০০০০.০০০.১৪.০০৮.১৮-১৩৩) পাঠানো হয়েছে। উপসচিব তাসলিমা আইমেদ শর্ষি স্বাক্ষরিত এই পত্রে কুতুবদিয়া-মগনামা চ্যানেলে ফেরি সার্ভিস চালুকরণের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও মতামত চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নদীর প্রস্থ, গভীরতা, খরস্রোতা কিনা, ভাঙন প্রবণতা, সারা বছর ফেরি চলাচলের উপযোগিতা, দৈনিক যানবাহনের সংখ্যা ও ধরণ, ফেরিঘাট পরিচালনার সম্ভাব্য আয়-ব্যয়, জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা পর্যটন কেন্দ্র, জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে প্রভাব, অ্যাপ্রোচ রোডের অবস্থা, ফেরিঘাট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও জনবলের সংস্থান এবং অর্থ বরাদ্দের সম্ভাব্যতা ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য চেয়ে বলা হয়েছে। এছাড়াও নদী পারাপারের রিয়েল টাইম ভিডিও চিত্রও চাওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ, ২৪ জুন ২০২৫ তারিখে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে (স্মারক নম্বর ৩৫.০০.০০০০.০১৫.৯৯.১১০.২৪-৩২৬) প্রধান প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপসচিব ফারজানা জেস্মিন স্বাক্ষরিত এই পত্রে মিজানুর রহমানের আবেদনটি সরেজমিনে যাচাইপূর্বক বিদ্যমান উন্নয়ন পরিকল্পনার আলোকে বিধি ও কার্যপদ্ধতি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সরকারের এই ইতিবাচক পদক্ষেপে কুতুবদিয়ার জনগণের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার হয়েছে। দ্বীপশিখা কুতুবদিয়ার ভাগ্য পরিবর্তনে মানববন্ধন এবং সড়ক বিভাগে চিঠি পাঠানোর মাধ্যমে যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তারই ফলস্বরূপ এই সরকারি উদ্যোগকে কুতুবদিয়াবাসী সাধুবাদ জানিয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে ফেরি সার্ভিস চালু এবং সড়কের মান উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

