কুতুবদিয়া—বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা এক বিস্ময়। যেখানে চলে জলরাশীর মধ্যে জনজীবনের লড়াই। প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকার ঠিকানা এই দ্বীপ। কিন্তু আজও এ দ্বীপের মানুষের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একটি পরিপূর্ণ বেড়িবাঁধ। প্রতি বছর বরাদ্দ আসে, বাজেট ঘোষণা হয়, কিন্তু কাজ হয় না। হয় যদি—তা কেবল কাগজে-কলমে। বাস্তবে বালির অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে যায় একে একে, আর দ্বীপ তলিয়ে যায় সাগরের জলে। প্রতিটি বর্ষা এখানে আতঙ্কের নাম। বিশাল ঢেউয়ে তছনছ হয়ে যায় মানুষের বসতভিটা, ফসলের জমি, লবণের মাঠ, গবাদি পশু-পাখি। লাখ লাখ টাকার ফসল পঁচে যায় জোয়ারের পানিতে। দ্বীপে সৃষ্টি হয় এক লুকায়িত দুর্ভিক্ষ, যার কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই, কিন্তু যার ভয়াবহতা প্রতিটি পরিবার নীরবে বহন করে চলেছে। মানুষ এখন নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে পিঠ লুকাচ্ছে আশেপাশের উপজেলায়। এক সময়ের মায়ার দ্বীপ আজ পরিণত হচ্ছে নিঃস্ব মানুষের কান্নায় ভেজা ভূমিতে। এই দ্বীপেই রয়েছে দেশের একমাত্র গন্ধকের খনি। রয়েছে অপার সৌন্দর্য নিয়ে বিস্তৃত সমুদ্র সৈকত। এখানে আছে অফুরন্ত জলরাশি—যা পর্যটন, খনিজ সম্পদ ও সমুদ্রভিত্তিক শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুতুবদিয়া চ্যানেলে অবস্থানরত মাদার ভেসেলগুলো থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করতে গিয়ে বিপুল খরচ গুনতে হয়—যা দেশের অর্থনীতিতেই চাপ তৈরি করে। খুদিয়ারটেকের বিশাল এলাকা, যা এখন কেবল বালির চর—সেখানে গড়ে উঠতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ বন্দর। কুতুবদিয়া হতে পারে বাংলাদেশের ‘ব্লু ইকোনমি’র অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সরকার যখন সমুদ্র অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন এই সম্ভাবনাময় দ্বীপ কেন রয়ে গেল অবহেলিত? হাতিয়া, সন্দীপ, মাতারবাড়ির মতো দ্বীপগুলো যখন উন্নয়নের আলোয় উদ্ভাসিত, তখন কুতুবদিয়া কেন শুধুই বঞ্চনার গল্প বয়ে বেড়াবে? আমাদের দ্বীপ, আমাদের অস্তিত্ব। একটি টেকসই বেড়িবাঁধ মানেই একটি দ্বীপের জীবন রক্ষা। আমরা আর বর্ষার জলে ভেসে যেতে চাই না, আমরা বসতভিটাহীন হতে চাই না, আমরা বাঁচতে চাই। আমরা কুতুবদিয়ার মানুষ। আমাদের দিকে তাকান। আমাদের দাবী শুনেন। আমরা বাঁচতে চাই। বাঁচার জন্য সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে একটি টেকসই বেড়িবাঁধ চাই।

