৩ বছর পর বিচারের দাবি: চকরিয়ার বরইতলীর মেধাবী ছাত্র আবিদ হত্যার বিচার আজও অন্ধকারে।

মতামত

২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর; চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের মেধাবী ছাত্র আবিদুর রহমান আবিদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল তৎকালীন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। দীর্ঘ ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও সেই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও সুদূরপরাহত। খুনিদের গ্রেফতার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে আজো ডুকরে কাঁদছে আবিদের পরিবার ও সহপাঠীরা।
​ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নিষ্ঠুরতা:
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর। পরীক্ষা শেষে হোস্টেলে ফেরার পথে আবিদ এবং তার আরও তিন সহকর্মী—ফয়সাল, নাজিম ও মাসুমকে তৎকালীন ছাত্রলীগ নামধারী একদল সন্ত্রাসী অপহরণ করে ছাত্র সংসদ (সিএসু) কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে টানা কয়েকদিন ধরে তাদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় আটকে রেখে বেদম প্রহার করা হলেও তৎকালীন কলেজ প্রশাসন বা পুলিশ তাদের উদ্ধারে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়নি।
​গুরুতর আহত অবস্থায় আবিদকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে এবং পরে চমেকে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ কয়েকদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ২১ অক্টোবর (শুক্রবার) রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলী গ্রামের এই কৃতি সন্তান।
​প্রশাসনের ভূমিকা ও তৎকালীন অস্থিরতা:
আবিদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চমেক ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গভীর রাতে একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভায় কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই সাথে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম স্থগিত এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, সে সময় খুনিদের গ্রেফতার করার পরিবর্তে কলেজ বন্ধ করে দিয়ে অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
​রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া:
আবিদ হত্যার পর ছাত্রদল ও তৎকালীন বিরোধী দলগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও এক বিবৃতিতে এই হত্যাকাণ্ডকে “অন্ধকার যুগের বর্বরতা” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেছিলেন যে, খুনিরা আওয়ামী মদদপুষ্ট হওয়ায় পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি ডাক্তাররা পর্যন্ত তৎকালীন আতঙ্কে যথাযথ চিকিৎসা দিতে ভয় পাচ্ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।
​বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আশার আলো:
আজ প্রায় ১৩ বছর পর যখন দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটছে, তখন নতুন করে বিচারের দাবি জোরালো হচ্ছে। আজ (জানুয়ারি ২০২৬) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিহত আবিদের পরিবারের সাথে সাক্ষাতের জন্য তাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। এই পদক্ষেপ আবিদের পরিবারের মনে দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ ও বিচার পাওয়ার আশা নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
​পরিবারের দাবি:
আবিদের বাবা নুরুল কবির এবং তার পরিবার আজো তাদের মেধাবী সন্তানের শূন্যতা অনুভব করছেন। বরইতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রটির হত্যাকারীরা কেন আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে, সেই প্রশ্ন আজ সারা দেশের ছাত্রসমাজের। তাদের একমাত্র দাবি—বিগত এক দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে অবিলম্বে আবিদ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *