উপকূলীয় মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি ও বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ চায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠী

পরিবেশ বিশেষ প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিবেদন:

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। সূত্র অনুযায়ী, আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহে সংসদবিহীন নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন বর্তমান সরকার।

উপকূল দেশের লবণ, চিংড়ি, পান ও পর্যটনসহ বিভিন্ন দিক দিয়ে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি করেছে। তাই উপকূলের গুরুত্ব অপরিসীম। এবারের বাজেটে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে অবহেলিত জনসাধারণ।

উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি উপকূলীয় মন্ত্রণালয় বা উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। তিনটি পার্বত্য জেলার জন্য আলাদা পার্বত্য মন্ত্রণালয় গঠন করা হলেও ১৯টি উপকূলীয় জেলার জন্য এখনো উপকূল মন্ত্রণালয় গঠন না হওয়ায় উপকূলবাসী হতাশ।

উপকূলের উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জেলার উপকূল কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া ও টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপসহ সেন্টমার্টিন এলাকার দশ লক্ষাধিক উপকূল জনগোষ্ঠীর সার্বিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে তারা বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ চায়।

জেলার দ্বীপ উপকূল কুতুবদিয়া, মহেশখালীর ধলঘাটা, মাতারবাড়ি, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ-সেন্টমার্টিনে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। এছাড়া কুতুবদিয়া পারাপারে ফেরি চালু দ্রুত বাস্তবায়ন করার দাবি জানিয়েছে দ্বীপবাসী। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করেন, উপকূলের টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও যাতায়াত সহজীকরণও দরকার। উপকূল অঞ্চলের অসহায় মানুষের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে সরকারের কাছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৯ জেলার ১৪৭ উপজেলার ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। প্রায় ২৮% মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে, যা দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।

প্রায় দুই কোটি উপকূলীয় মানুষ ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে সম্পূর্ণ অরক্ষিত। প্রতিবছর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ তাদের বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে স্থানচ্যুত হচ্ছে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানির আগ্রাসনে উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠা পানির প্রাপ্যতা এখন দুর্লভ হয়ে পড়েছে, ফলে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে ভুগে রোগাক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

উপকূলীয় অঞ্চলে ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস বারবার আঘাত হানার কারণে সড়ক অবকাঠামো, বসতবাড়ী, কৃষিজমি বিনষ্ট হয়। কৃষিজমিসমূহ লবণাক্ততার কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য উর্বরতা হারায়, ফলে ফসল উৎপাদন হ্রাস পায়। সরকারি-বেসরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা তাদের নিকট প্রত্যাশিত হারে ও সময়মতো পৌঁছায় না।

বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড় মোখা, সিত্রাং, সিডর, লায়লা, নারগিসসহ অন্যান্য নামে উপকূলে আঘাত হানে। আতঙ্ক ও আশঙ্কা থেকে প্রতিকারে সুপার ডাইকের আওতায় উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন বলে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন।

বিভিন্ন তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এসব অঞ্চলের জীবনযাত্রাকে অচল করে রেখেছে। যুগের পর যুগ পিছিয়ে থাকলেও উপকূলের জন্য সুনির্দিষ্ট গণমাধ্যম উদ্যোগ নেই বললেই চলে। উপকূলবাসীকে সমুদ্রের ভয়াল ছোবল থেকে রক্ষায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও উপকূলীয় বনায়নের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানে যেসব আশ্রয়কেন্দ্র আছে, সেগুলোর অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যবহার উপযোগিতা হারিয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সংস্কার ও ব্যবহার উপযোগী করে তোলা এবং দেশের উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে যুগোপযোগী উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাবই উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দুরাবস্থার মূল কারণ বলে মনে করেন সচেতন মহল। এছাড়া প্রয়োজনীয় শিক্ষার অভাব ও অসচেতনতার কারণেই উপকূলবাসী এখনও অনগ্রসর থেকে যাচ্ছে।

সরকারি-বেসরকারি কোনো কর্মসূচি সেখানকার মানুষের ঝুঁকি এখনও কমাতে পারছে না বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। মূল ভূখণ্ড ও উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের সবসময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। বাংলাদেশ সরকার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাসের জন্য বেশ কিছু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যেমন:

* জাতীয় পরিবেশ নীতিমালা, ১৯৯২

* উপকূলীয় অঞ্চল নীতিমালা, ২০০৫

* জাতীয় অভিযোজন কর্মসূচি, ২০০৫

* বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা, ২০০৯

* জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (২০১০-২০১৫)

* জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা, ২০০১

* দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২

এছাড়াও সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ক্লাইমেট চেঞ্জ সেল, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড প্রতিষ্ঠা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড-এর অর্থায়নে উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবেলা এবং মানুষের ঝুঁকি মোকাবেলায় অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও বিদেশী সাহায্য সংস্থার অর্থায়নে উপকূলীয় এলাকার দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি হ্রাস এবং সমাজভিত্তিক জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন এবং বনায়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এসব কর্মসূচি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও সক্ষমতা তৈরীতে ভবিষ্যতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন উপকূল বিশেষজ্ঞরা।

 

হুমায়ূন সিকদার

শিক্ষক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *